সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপ আলোচনা করো।

 ★ধর্মমঙ্গলের কাহিনি:–

ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনি—হরিশ্চন্দ্র ও লাউসেনের কাহিনি।

 ১. হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি:–

রাজা হরিশ্চন্দ্র ও তার রানি মদনা নিঃসন্তান হওয়ায় সমাজে লোকনিন্দার ভয়ে মনের দুঃখে ঘুরতে ঘুরতে বল্লুকা নদীর তীরে উপস্থিত হয়ে দেখেন সেখানে ধর্মঠাকুরের ভক্তেরা ঘটা করে দেবতার পূজা করছেন। রাজা ও রানি তাদের কাছে ধর্মঠাকুরের। মাহাত্ম্য শুনে ধর্মঠাকুরের পূজার্চনা করে শর্তসাপেক্ষে বর লাভ করেন। শর্ত হল এই তাদের পুত্রকে ধর্মঠাকুরের কাছে বলি দিতে হবে। যথাসময়ে মদনার পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। রাজা ও রানি পুত্রকে পেয়ে ধর্মঠাকুরের কাছে বলি দেওয়ার পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। ধর্মঠাকুর ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে একদিন হরিশ্চন্দ্রের কাছে উপস্থিত হন। সেদিন ছিল। একাদশীর পারণ; ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ রাজপুত্র লুইধরের মাংস আহার করতে চাইলে রাজা ও রানি পুত্রকে বধ করে তার মাংস রান্না করলেন। রাজা ও রানির এই আনুগত্য ও নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে ধর্মঠাকুর লুইধরকে জীবিত করে পুনরায় রাজা-রানির কাছে ফিরিয়ে দেন। এরপর রাজা ও রানির প্রচেষ্টায় ধর্মঠাকুরের পূজা মহাসমারোহে আয়োজিত হতে থাকে।

২. লাউসেনের কাহিনি:–

নায়ক লাউসেনের জন্ম থেকে স্বর্গ গমন পর্যন্ত কাহিনি অবলম্বনে এই কাব্য রচিত কাব্যের কাহিনি চব্বিশটি সর্গ বা বারটি পালায় বিভক্ত। মর্ত্যে পূজা প্রচারের জন্য দেবনর্তকী জাম্ববতীকে স্বর্গভ্রষ্ট করিয়ে মর্ত্যে পাঠানো হয়। তার নাম হয় রঞ্জাবতী। তার বড় বোন ছিলেন গৌড়রাজের পত্নী, ভাই মহামদ প্রধান অমাত্য। অন্যদিকে ঢেকুরগড়ের অধিপতি কর্ণসেন ছিলেন গৌড়েশ্বরের অধীনে এক সামন্ত রাজা। ঢেকুরগড়ের বিদ্রোহী রাজা ইছাই ঘোষকে দমন করতে গিয়ে তার ছয় পুত্র যুদ্ধে নিহত হলেন। এরপর গৌড়েশ্বর তাঁর শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিয়ে দেন। এই বিয়েতে মহামদের অমত ছিল। তাই সব রাগ গিয়ে পড়ল বোন ও ভগ্নিপতির উপর। নানাভাবে তাদের উপর অত্যাচার শুরু করলেন মহামদ। তারপর বহুদিন পর্যন্ত রঞ্জাবতী নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু ধর্মঠাকুরের কৃপায় কর্ণসেন এক পুত্রসন্তান লাভ করেন এবং তার নাম হয় লাউসেন। লাউসেন ক্রমে মস্ত বীর হয়ে ওঠে। এই লাউসেন-এর উপরও রাগ গিয়ে পড়ে মহামদের। 

শক্তি পরীক্ষার জন্য লাউসেন একবার গৌড়ে যান। সে সময়ে মাতুল মহামদ লাউসেনকে বন্দী করে। কিন্তু গৌড়েশ্বরের কাছে লাউসেন তার বাহুবলের পারদর্শিতা দেখিয়ে কারামুক্ত হন। এরপর ময়নাগড়ে ফেরার পথে কালু ডোম ও তার স্ত্রী লখাই-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ও কালু ডোম সেনাপতির পদ লাভ করেন। 

এদিকে মহামদ লাউসেনের অনিষ্ট সাধনের উপায় খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। মহামদের পরামর্শে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে কামরূপ রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠান। সেখানেও কামরূপ রাজাকে পরাভূত করেন লাউসেন এবং তার কন্যা কলিঙ্গাকে বিবাহ করে গৌড়ে সগৌরবে প্রত্যাবর্তন করেন।

 এরপর ঢেকুররাজ ইছাই ঘোষকে দমন করার জন্য লাউসেনকে পাঠান হল। অজয় নদীর তীরে দুপক্ষে ভীষণ যুদ্ধ বেধে গেল। ধর্মের আশীর্বাদে লাউসেন বিজয়ী হলেন। এত দুরভিসন্ধি করেও মহামদ যখন লাউসেনকে বিপদে ফেলতে পারছেন না তখন তার বিরুদ্ধে এক ভীষণ চক্রান্ত করলেন মহামদ। গৌড়েশ্বর আদেশ দিলেন লাউসেনকে পশ্চিমদিকে সূর্যোদয় দেখাতে হবে, না পারলে মৃত্যুদণ্ড হবে। ধর্মের কৃপায় লাউসেন সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেখালেন। এদিকে এই অবকাশে মহামদ ময়নাগড় আক্রমণ করেন। তাঁকে প্রতিরোধ করতে প্রাণ দেন কালু ডোম, ডোমনী লখাই ও প্রথম রানি কলিঙ্গা। এরপর লাউসেন দেশে ফিরে এসে যখন দেখলেন রাজ্য বিধ্বস্ত, তখন তিনি ধর্মের স্তব করতে লাগলেন। ধর্মের অনুগ্রহে সকলে প্রাণ ফিরে পায়। ধর্মের কোপে মহামদের কুষ্ঠ হয়। লাউসেনের দয়ায় তার কুণ্ঠ সারে। সুখে-শান্তিতে দীর্ঘকাল রাজত্ব করার পর পুত্র চিত্রসেনের হাতে রাজ্য সমর্পণ করে সপরিবারে স্বর্গ গমন করেন লাউসেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ধর্মমঙ্গল কাব্যের অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় দাও।।।।

         ■ অষ্টাদশ শতাব্দী – শ্রেষ্ঠ কবি                    • ঘনরাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গল কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি হলেন ঘনরাম চক্রবর্তী। ঘনরাম অষ্টাদশ শতাব্দীর শক্তিমান কবি। মঙ্গলকাব্যের ঐশ্বর্যযুগের শেষ পর্যায়ে রামেশ্বর ভট্টাচার্যের শিবায়ন, ঘনরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল এবং ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল নির্বাণোন্মুখ দীপশিখার মতো সর্বশেষ জ্যোতি।  সুকুমার সেন লিখেছেন,– “ধর্মমঙ্গল রচয়িতাদের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ ছিলেন ঘনরাম চক্রবর্তী। ঘনরাম সুলেখক ছিলেন। তাঁহার রচনা সর্বাধিক পরিচিত ধর্মমঙ্গল কাব্য”। ( বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫১ )।  অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও লিখেছেন, –“আধুনিক যুগের বাঙালী সমাজ তাঁহার কাব্য হইতেই ধর্মমঙ্গল কাব্যের নূতনত্ব উপলব্ধি করিয়াছিলেন। এই শাখার অন্যান্য শক্তিশালী কবি অপেক্ষা ঘনরাম অধিকতর ভাগ্যবান। কারণ ধর্মমঙ্গলের কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মার্জিত রুচির নাগরিক সমাজে পরিচিত হন। ( বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, তৃতীয় খণ্ড, দ্বিতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা-৯৮ ...

ধর্মমঙ্গল কাব্য কে কেন রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলে অভিহিত করা হয় ??

ধর্মমঙ্গল বিষয়বস্তুর প্রাচীনত্বে ও বিভিন্ন ধর্মমতের সমন্বয় প্রয়াসের প্রত্যক্ষ নিদর্শন রূপে ধর্মমঙ্গল কাব্যই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মধ্যযুগীয় দৈব নির্ভরতাবাদী মঙ্গলকাব্য ধারায় ধর্মমঙ্গলের স্থান কিছুটা ভিন্ন ধরনের। এই স্বাতন্ত্র্য্য মূলত ধর্মঠাকুরের স্বরূপে, ভৌগোলিক অবস্থানে এবং বিষয়বস্তুর বর্ণনা ভঙ্গিমায়। তাই এই কাব্য নিয়ে নানা দাবী উপস্থাপিত হয়েছে। এমনও দাবী করা হয়েছে যে ধর্মমঙ্গল রাঢ়ের জাতীয় কাব্য। ★ধর্মমঙ্গল কাব্যের ঐতিহাসিকতা :– ধর্মমঙ্গলের কাহিনির পেছনে যে ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু রয়েছে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাল বংশের সমাপ্তি পর্বকে এই কাহিনির পটভূমি হিসাবে মনে করা হয়। এই কাহিনির ইছাই ঘোষ, লাউসেন ঐতিহাসিক ব্যক্তি। এই কাব্যে যুদ্ধ-বিগ্রহজনিত উত্তেজনামূলক ঘটনা প্রাচুর্যময় বাংলার ঘটনাকেই সূচিত করে। ধর্মঠাকুরের উৎসব কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের উৎসব। অন্যান্য মঙ্গলকাব্যে সাধারণ বাঙালির যে মেরুদণ্ডহীন নমনীয়তা দেবতার অভিপ্রায়ের কাছে সমর্পিত হয়েছে, তার বিপরীত রূপটিই এখানে প্রকাশিত। ধর্মমঙ্গলে রাঢ়ের রাজনৈতিক জীবনযাত্রা ও তার নিম্নশ্রেণির নর-নারীর মহিমান্বিত দেশাত্মবোধের যে...